চট্টগ্রাম, , সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০

সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসায় পালিত হোক সঙ্গীত দিবস

প্রকাশ: ২০১৯-০৬-২০ ১৮:০৬:৩২ || আপডেট: ২০১৯-০৬-২০ ১৮:০৬:৩২

আগামীকাল শুক্রবার ২১ জুন বিশ্ব সঙ্গীত দিবস। সঙ্গীতের প্রতি ভালোলাগা ও ভালোবাসার কারনে ‘সঙ্গীত’ একটি জাতীয় দিবসের মর্যাদা লাভ করেছে। কথা, সুর, সঙ্গীতে আমরা এগিয়ে চলেছি। বাংলাদেশের সংগীতের ঐতিহ্য অনেক সমৃদ্ধ। যুগে যুগে সঙ্গীত স্রষ্টা ও শিল্পীরা আমাদের এই ধারাকে সামনের দিকে নিয়ে গেছেন, করেছেন সমৃদ্ধ সম্পদশালী। সঙ্গীত মানুষের মনকে করে প্রফুল­, বিষন্নতায় এনে দেয় প্রাণ, নির্লিপ্ত মনকে জাগিয়ে তোলে। মনের ভেতরে সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধন করে, আমাদের বোদ্ধা শ্রোতারা বর্তমানে অভিযোগের সুরে বলেন, এখন যেসব গান হচ্ছে তা মোটেই শিল্প সম্মত গান নয় অথচ আগে কত ভাল গান হতো, যা শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যেত। যুগ যুগ টিতে থাকত। এখানকার গান এক কান দিয়ে শুনলাম তো আরেক গান দিয়ে বের হয়ে যায়। মনে দাগ কাটার মত তেমন কোন গান নেই। এখনকার গানের বিচ্ছিরি অবস্থা। সস্তা কথার বাজে কথার গানতো হচ্ছে পাশাপাশি চলে হিন্দি গানের নকল। বর্তমানে সংগীত চর্চা ও সংগীতের প্রচার প্রসার সব ইন্টারনেট কেন্দ্রিক। ফেইসবুক আর ইউটিউবই গানের বিচরণ। সব গানের কথা প্রেম ভালবাসা, সুর বিরহ, ভিডিওগ্রাফী দুর্ঘটনা, মৃত্যু প্রেমের প্রত্যাখ্যান এ নিয়েই চলছে বর্তমান সঙ্গীতের জোয়ার ও বাজার।

গীতিকার মনিরুজ্জমান মনির- এর ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায় যে ছিল হৃদয়ের আঙ্গিনায় সে হারালো কোন দুল অজানায়’ ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ মরণ বাংলাদেশ জীবন বাংলাদেশ, আপেল মাহমুদের লেখা ‘তীর হারা এ ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দিবরে, গীতিকার এস.এম. হেদায়েত এর লেখা ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা শুধু দু’জনে চলনা ঘুরে আসি অজানাতে যেখানে নদী এসে থেমে গেছে’ গীতিকার মরহুম নজরুল ইসলাম বাবুর লেখা একটি, বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতা, হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে, গাজী আবদুর রাজ্জাকের লেখা ‘আমি বৃষ্টির কাছে কাঁদতে শিখেছি, মাসুদ করিমের লেখা আমি রজনীগন্ধা ফুলের মত গন্ধ বিলাতে চাই। শাফাত খৈয়ামের লেখা ‘মনতো পাথর নয়, হামিদুল ইসলামের লেখা ‘আমি হবো গো তোমার মনের বাগানে একটি রজনী গন্ধা, আবু হেনা মোস্তফা কামালের ‘আমার সাগর নীল নয়নে মেঘের কাজ এঁকেছি, ডা. গোলাম মোস্তফার লেখা, আবদুল মান্নান রানার গাওয়া যেখানে যাও ভালো থেকো, সুখে না হয় দুঃখে আমায় ডেকো’ নাতিন বরই খা, ওরে সাম্পান ওয়াল, আমি ধন্য হয়েছি ওগো ধন্য ইত্যাদি এই জনপ্রিয় গান গুলোর মত শ্র“তিমধুর গান এখানো পর্যন্ত অন্য কোন গান দর্শক হৃদয়ে সাড়া জাগাতে পারেনি এ আমাদের ব্যর্থতা এ আমাদের দৈন্যতা। রবীন্দ্র সঙ্গীতে জাহিদুর রহিম (মরহুম), অজিত রায়, সানজিদা খাতুন, পাপিয়া সারোয়ার, সাদী মোহাম্মদ, তপন মাহমুদ, কাদেরী কিবরিয়া, রেজওয়ানা চৌধুরী বর্না সহ অনেকে। নজরুল সঙ্গীতে – সোহরাব হোসেন, খালিদ হোসেন, ফিরোজা বেগম, গোলাম সোহরাব, শবনম মুশতারী, এম.এ মান্নান, ফাতেমা-তজু-জোহরা, যোসেফ কমল রড্রিক্স, সাদিয়া আফরীন মলি­ক প্রমুখ। পল্লীগীতিতে আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, আবদুল আলীম, রতীন্দ্র নাথ রায়, ফেরদৌসী রহমান, মোস্তফা জামান আব্বাসী, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, নীনা হামিদ, মীনা বড়–য়া, নাদিরা বেগম, দিলরুবা খান, মমতাজ প্রমুখ। লালনগীতিতে ফরিদা পারভিন প্রমুখ সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। আধুনিক সঙ্গীতে আবদুল জাব্বার, মাহমুদুন নবী (মরহুম), রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, শাহনাজ রহমত উল্লাহ, আবিদা সুলতানা, শাম্মী আখতার, নার্গিস পারভীন, আনজুমান আরা বেগম, রওশন আরা মোস্তাফিজ, রফিকুল আলম, সৈয়দ আবদুল হাদী, খুরশিদ আলম, বশির আহমেদ, শেফালী ঘোষ, শ্যাম সুন্দর বৈষ্ণব, প্রবাল চৌধুরী, উমা খান, আবদুল মান্নান রানা, এন্ড্রুকিশোর, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, শেখ ইশতিয়াক, কনক চাঁপা, সামিনা চৌধুরী, শুভ্রদেব, শাকিলা জাফর, বেবী নাজনীন, ডলি সায়ন্তনী, মনির খান, থেকে আরো অনেকে সাম্প্রতিক সময়ে কাজ করছেন এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে আজাদ রহমান আখতার সামদানী, মরহুমা নিলুফার ইয়াসমিন, নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী, মোহাম্মদ হান্নান প্রমুখ কাজ করে যাচ্ছেন উলে­খিত শিল্পীদের মতো পরবর্তীতে অন্য কোন শিল্পী এসে আমাদের সঙ্গীতাঙ্গনে শ্রোতাদের মন জয় করতে পারেনি।

ভাল গান খুব একটা হচ্ছে না। খারাপ গান বেশি হচ্ছে। যাও দু’একটা হচ্ছে তাও আবার দর্শক শ্রোতার কাছে গিয়ে পৌঁছায় না। সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের সাথে কথা বলার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সুপারিশমালা দিতে পারি যে, যদি ভাল গান করতে হয়, দর্শক শ্রোতাদের সত্যিকার অর্থে নিজস্ব সংস্কৃতির মাধ্যমে আনন্দ দিতে হয় এবং সঙ্গীতকে যুগ যুগ ধরে রাখতে হয় তাহলে তেমন প্রচেষ্টাই করা উচিত এখনই তার সময়। গীতিকারকে পরিচ্ছন্ন শিল্প সম্মত, মননশীল, মিষ্টি কথার গান লিখতে হবে একান্ত নিজস্ব মনের মাধুরী দিয়ে লিখা। চেষ্টা করতে হবে যাতে করে অশ্লীল পরিহার করতে হবে। সর্বোপরি একজন শিল্পীর মন মানসিকতা হতে হবে এমন যে, তিনি শিল্পের সেবা করছেন। তাই টাকার বিনিময়ে যে কোন ধরনের গান করবেন না। কিংবা সস্তা জনপ্রিয়তা পাবার জন্য কোন বাজে গান করবেন না। যদি কোনো শিল্পী এই ধরনের গান করেন তাহলে সেই শিল্পীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বেতার, টিভি, মঞ্চ, স্যাটেলাইট চ্যানেল-এ যে সমস্ত গান হচ্ছে শিল্পমান বিচারে সেগুলো কতটুকু উত্তীর্ণ? তা ভেবে দেখার বিষয় বৈকি।

প্রথমত: তখন গীতিকারের সংখ্যা ছিল খুবই কম। সুতরাং গানও ছিল স্বল্প সংখ্যক। তাই ও সময় গানগুলো বারবার গাওয়া হতো। ফলে তখনকার গানগুলো শ্রোতার কাছে খুব সহজেই পরিচিত হয়ে উঠতো। আমি মনে করি বার বার একটা গান শোনার ফলে ঐ গানটা কারো না কারো মনে দাগ কেটে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত: তখনকার গীতিকার সুরকার ও শিল্পীরা ছিলেন একনিষ্ট। এ একনিষ্ঠতাও তখনকার গান গুলোকে শ্রুতিমধুর করে তুলতো এবং জনপ্রিয়তা পেয়ে যেতো খুব সহজেই। আগের দিনে একজন সুরকার যা চাইতেন একজন শিল্পী তা মনোযোগের সাথে উপলব্ধি করে তার গায়কীর মধ্যে ফুটিয়ে তুলতেন। তবে বর্তমানে গীতিকারের সংখ্যা বেশী হওয়াতে গানের সংখ্যাও বেড়ে গেছে। এখন এত বেশী আধুনিক গান লেখা হচ্ছে এবং গাওয়া হচ্ছে যে তার মধ্যে শতকরা ২০% ভালো গান হচ্ছে না। তার প্রথম কারণ গানের কথাগুলো ভাবাবেগ পূর্ণ নয়। তার মঝে কোন গভীরতা নেই হৃদয় স্পর্শী কোন কথা নেই। দ্বিতীয় কারণ শিল্পীদের মধ্যে একনিষ্ঠতার অভাব রয়েছে এবং এখনকার সুরকার গীতিকার শিল্পীর মাঝে কোন সামঞ্জস্যতা নেই। সুতরাং একটা গান ভালো হওয়ার পেছনে শিল্পী সুরকার গীতিকার তিনজনের সমান অবদান রয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে আবার এটাও দেখতে হবে যাতে গানটি উপযুক্ত শিল্পীকে দিয়ে গাওয়ানো হয়। অনেক সময় দেখা যায় গীতিকার সাজিয়েছেন খুব সুন্দর কথা মালা। কিন্তু সুরকার বা উপুক্ত গায়কীর দোষে গানটি মর্ম স্পর্শী হয়েও শ্রোতার হৃদয়কে স্পর্শ করে যেতে পারলো না, সে ক্ষেত্রে গীতিকারের চাওয়া পাওয়াটা প্রতিফলিত হলোনা। সুতরাং হারিয়ে গেল তার এত কষ্টে লেখা কথা মালা। সুরের ঝর্ণা হয়ে আর বয়ে গেল না হৃদয় হতে হৃদয়ে। কারণ গীতিকার যা চেয়েছেন সুরকার তা সুর করতে পারেনি বা শিল্পী তা ফুটিয়ে তুলতে পারেনি। তৃতীয় কারণ: বর্তমানে গান এবং শিল্পীর সংখ্যা বেশী হওয়াতে শ্রোতারা প্রতি মুহুর্তে এত বেশী গান শুনছেন যে, কোনটা শুনে কোনটায় বা মনে রাখেন? এত অল্প সময়ে এত গুলো গান মেনে রাখা খুবই কঠিন ব্যাপার। তারপরও এসব গানের মধ্যে থেকে কোন না কোন একটা গান শ্রোতা হৃদয়ে দাগ কেটে যায়। তারপরও আমি বলবো বর্তমানে ভালো গান হচ্ছে না তা নয়, আমরা আসলে মনে হচ্ছে সংস্কৃতির প্রতি একটু বেশী বেশী আগ্রহী হয়ে ওঠাতে এমনটি মনে হচ্ছে বাংলাদেশে গান ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। যুগে যুগে এ গান চির সবুজ হয়ে বেঁচে থাকবে নতুন প্রজন্মের কাছে।

স্বাধীনতার পূর্বে বাংলা গানের অবস্থা খুবই ভালো ছিল তখনকার গানের বাণী, সুর খুব উন্নতমানের ছিল। গানের দৈন্যদশা শুরু হয়েছে নব্বই দশক থেকে যা আজো চলছে। তার কারণ হলো এখনকার যারো গান লেখে তাদের অনুশীলন করা অভ্যাস কম, পড়ালেখা করে না, গান নিয়ে চর্চা করে না, গানের বাণী উন্নতির জন্য যতটুকু শ্রম মেধা দেওয়া প্রয়োজন তা দেয় না। ভাল গান লিখতে আধুনিক কবিতা পড়তে হবে তা অবশ্যই দেশ-বিদেশের সেরা লেখকদের বই হতে হবে। লাইনের পর লাইন বসালে গান হয় না। সব গীতিকার কবি, সব কবি গীতিকার নয়। তথাকথিত পপ গান এসে আমাদের গানের পরিবেশটাকে বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। যেমন কথার ঠিক নেই তেমন সুরও ঠিক নেই এ অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশের মধ্যে কিছু গীতিকার ভাল গান লেখার জন্য চেষ্টা করছে। এখনকার গানের পরিবেশ একদম নষ্ট হয়ে গেছে। কোন ভাবে একজন শিল্পী একটা ক্যাসেট বের করতে পারলে মনে করে সে অনেক বড় শিল্পী হয়ে গেছে। এখানেই প্রথম সর্বনাশটা হয়ে যাচ্ছে। ভারতের গীতিকার গৌরিপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দোপাধ্যায়, শ্যামল গুপ্ত বাংলাদেশে আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মাসুদ করিম, নজরুল ইসলাম বাবু যে গান লিখে গেছেন তা আধুনিক গানের জগতে পাথেয় হয়ে থাকবে। নতুন যারা আসছে তারা প্রবীণ কোন গীতিকারের কাছ থেকে গান লেখা শিখা বা নিয়ম কানুন সম্পর্কে জানতে চাই না এটা শিল্পী সুরকারের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভাল কিছু করার মানসিকতা আমাদের নেই কমসময়ে পরিশ্রম না করে যা করা যায় তা করছি।

যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজ এবং রাষ্ট্রে এবং কর্তা ব্যক্তিরা আন্তরিক না হবেন এই অসম ব্যবস্থা প্রতিরোধ না করবেন, গুণীদের কদর করতে মর্যাদা দিতে না শিখবেন, সুন্দর সৃজনশীল সামাজিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রত্যেকে এগিয়ে না আসবেন, অবক্ষয়ের হাত থেকে প্রতিটি সন্তানকে রক্ষা না করবেন ততক্ষণ নতুন কিছু আশা করা অমূলক, সামাজিক উত্তরন অসম্ভব, যাপিত জীবন ব্যবস্থা কাঙ্খিত এবং উপযোগী করে নেওয়া দুস্কর। শিল্পী সুরকার ও গীতিকারদেরকে প্রকৃত সম্মান দিতে জানলে বৃটিশ ব্যবস্থার পরিবর্তন করে একটি নীতিমালা করলে সিনেমা জগত কলুষমুক্ত করলে, ছাত্র, যুবক, তরুণদেরকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারলে আধুনিক বাংলা গানের দৈন্যদশার উত্তরণ হবে। তখনই জাতীয় সঙ্গীত দিবসটি আমাদের কাছে যথাযোগ্য মনে হবে এবং বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গন উজ্জ্বল হবে। সঙ্গীতের প্রতি ভালোবাসা পালিত হোক সঙ্গীত দিবস।

লেখক: আবছার উদ্দিন অলি

ট্যাগ :