চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর ২০২০

সিডিএর আলোচিত প্রায় ২ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার পতেঙ্গা রিং রোড ধস, প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ: ২০১৯-০৭-১৪ ১৫:১৫:৩৯ || আপডেট: ২০১৯-০৭-১৪ ১৫:১৫:৩৯

এ.এস.রানা: চট্টগ্রামের অন্যতম মেগা প্রজেক্ট আউটার রিং রোডের ওয়াকওয়ে ও স্ল্যাব ধসের ঘটনা ঘটেছে। রোডের পতেঙ্গা অংশে বেশ কিছু স্থানে এসব ওয়াকওয়ে ও স্ল্যাব ধসের ঘটনা ঘটে। এতে করে কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।

শনিবার (১৩ জুলাই) সকালে অব্যাহত ভারী বর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারে পানির তোড়ে নগরীর পতেঙ্গা থানার খেজুরতলার এলাকার সাগর পাড়ের আউটার রিং রোডের ওয়াকওয়ের কয়েকশত ফুট ধসে যায়। বিষয়টি ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষনের পাশাপাশি অনেকে সিডিএর আলোচিত প্রায় ২ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার এ প্রকল্পের কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

নগরবাসীর এমন সমালোচনার মুখে দুপুরে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন সিডিএর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেখান থেকে মানুষজনকে সরিয়ে দিয়ে ওয়াকওয়েটি সংস্কারের কাজ শুরুর উদ্যোগ নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান স্পেকট্রা ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন।

এই ব্যাপারে সরেজমিনে দেখতে গেলে ঘটনাস্থলেই কথা হয় নির্মাণ কাজের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী মিরাজুল ইসলামের সাথে। তিনি ওয়াকওয়ে ধসের খবর শুনে আরো ৪/৫ জন প্রকৌশলী নিয়ে পরিদর্শনে এসেছেন। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে শুরুতেই বিরক্তি প্রকাশ করেন কথাও বলতে নারাজ ছিলেন।

তিনি বলেন, এটা সামান্য একটা ঘটনা। নিচ থেকে বালু সরে যাওয়ার কারণে এটা হয়েছে। তাছাড়া এখনো কাজ শেষ হয়নি। চলমান একটা কাজ। ধসে পড়েছে আমরা দেখতে এলাম , দ্রুত সারিয়ে নিবো। এটা নিয়ে এত লেখালেখির কিছু নেই।

স্থানীয় একজন বাসিন্দা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, ‘শুরু থেকেই সিডিএর এ কাজের মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। সাগরের পাড় ঘেঁষে মূল বেড়িবাঁধের পাশে যে ওয়াকওয়েটি নির্মাণ করা হয়েছিল, সেটি সকালে জোয়ারের পানিতে কয়েকশত গজ ধসে যায়। মূলত গাইডওয়াল দিয়ে সেখানে যেনতেনভাবে বালি ভরাট করায় বালি পানির তোড়ে সরে যায়। ফলে সিসি ঢালাই করা ওয়াকওয়ে ধসে পড়ে।’ ওয়াকওয়েটা সিসি ঢালাই না করে আরসিসি ঢালাই করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন স্থানীয় এ বাসিন্দা।

তবে এই ধসের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস। তিনিও ঠিকাদারের সুরে বলেন , অতি বৃষ্টিতে স্লাবের নিচের বালি সরে যাওয়ায় এই ঘটনা ঘটেছে।তবে এটা হতেই পারে।যেহেতু ভুমি ধসে কারো হাত থাকেনা।

ওয়াকওয়ে নির্মাণে আরসিসি (রড) না নিয়ে সিসি (কংক্রিট) দেয়া হয়েছে কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আরসিসি দিয়ে ব্লক তৈরি করা যায় না। সিসি দিয়ে ব্লক তৈরি করতে হয়। আরসিসি ব্লক নির্মাণ করলে এতে এটার টেম্পারে ব্যাঘাত ঘটে। এতে পরে সমস্যা দেখা দেয়।

তবে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনের ভাষ্য ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘সাধারণত সাগরপাড় ঘেঁষে এসব প্রকল্পে অনেক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। এ ধরনের কাজগুলো পাইলিংয়ের ওপর হয়। এছাড়া অতিরিক্ত ভার বহন করার প্রয়োজন হলে সেখানে প্রিকাস্ট কংক্রিট পাইল ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ধসে পড়া ওয়াকওয়েটির ক্ষেত্রে এসব করা হয়নি বলেই তা ধসে পড়েছে।’

এ অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘এটি আন্তর্জাতিকমানের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আর মেনেই করা হচ্ছে। এখানে তো গাইডওয়াল ধসে পড়েনি। ওয়ালে একটা-দুটো ফুটো হওয়ায় জোয়ারের পানির তোড়ে বালি চলে যাওয়ায় এরকম হয়েছে। হয়তো ওখানে হয়েছে। অন্য কোনো স্থানে তো এরকম হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সিডিএ চেয়ারম্যান জহিরুল আলম দোভাষ বলেন, ‘বিষয়টা আমি জেনেছি। রবিবার পতেঙ্গায় পরিদর্শনে যাব। তারপর করণীয় কি তা ঠিক করব।’

এ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দোভাষ বলেন, ‘আমি তো নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। এ প্রকল্পের কাজ আগের চেয়ারম্যানের সময় করা। এরপরও দুর্নীতির বিষয়টি খতিয়ে না দেখে বলতে পারব না। সবকিছুরই খোঁজ নেবো। দুর্নীতি হলে কেউ পার পাবে না।

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের জুলাইয়ে চার লেনের আউটার রিং রোড নির্মাণ কাজ শুরু হয়। আড়াই হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তাবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ(সিডিএ)। চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালেই প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। উপকূলীয় বাঁধ কাম আউটার রিং রোড নির্মাণ নামে এই প্রকল্পের আওতায় ১৭ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ হবে। এর মধ্যে ১৫ দশমিক বিশ কিলোমিটার মূল ও ২ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক।

শুরুতে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৮৬৫ কোটি ২৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা। দুই বার সংশোধনের পর বর্তমানে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪২৬ কোটি ১৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ১ হাজার ৭২০ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার ও জাইকার সহায়তা ৭০৬ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্পের বেশিরভাগ কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৯ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা।

ট্যাগ :