চট্টগ্রাম, , শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১

জলবায়ু পরিবর্তনে অস্থিত্বের প্রয়োজনে জরুরী ব্যবস্থা নিতে হবে

প্রকাশ: ২০১৯-১১-১৩ ১৭:০২:৫৩ || আপডেট: ২০১৯-১১-১৩ ১৭:০২:৫৩

জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখন আর শুধুমাত্র উৎকন্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন সমাজের মধ্যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্যোগ পরিস্থিতি ও ঝুঁকি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্ব আজ জরুরী ভিত্তিতে অধিক গবেষণা ও কর্মসূচী নিতে দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞানীরা বিগত ৪০ বছরব্যাপী সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে বিজ্ঞানীরা এখন পৃথিবীর জন্য জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছেন। বিজ্ঞান বিষয়ক সাময়িকী “বায়োসাইন্স”-এ প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটির স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১ হাজার বিজ্ঞানী। প্রতিবেদনে সংকট মোকাবিলায় আমূল ও টেকসই পরিবর্তন ছাড়া “অবর্ণনীয় দুর্যোগের” পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে। বুধবার বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদী এ গবেষণার প্রতিবেদনটির প্রধান গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব সিডনির ডক্টর থমাস নিউসাস বলেন, জরুরী অবস্থা মানে হচ্ছে, আমরা যদি এখনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পদক্ষেপ না নিই, তাহলে ভবিষৎতে পরিবর্তনজনিত প্রভাব বর্তমানের চেয়ে অধিকতর মারাত্মক ও গুরুতর হয়ে উঠবে। এজন্য পৃথিবীর কার্বন নি:সরণ, গবাদি পশুর উৎপাদন, গাছ কেটে জমি উজাড় করা ও ফসিল জ্বালানী ব্যবহার কমাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ভয়াবহতার স্বরূপ অনুধাবন করে জরুরী পদক্ষেপকে কোনো অবস্থায় ছোট করে দেখা সমুচিত হবে না। এ ঘোষণার নৈপথ্যে যথেষ্ট যুক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে যাওয়া পৃথিবীর ভবিষৎকে মারাত্মকভাবে আশংকার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এ নিয়ে দুুনিয়াব্যাপী বিপুলভাবে হতাশা তৈরি হয়েছে।

গবেষকরা এ সাময়িকীতে উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে কিছু কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঝুঁকির মধ্যে সমাজ। নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ৪০ বছরে প্রতি দশকে বাতাস ও সোলার শক্তির ব্যবহার বেড়েছে ৩৭৩ শতাংশ হারে। তা সত্ত্বেও ২০১৮ সালে জীবাশ্ম জ্বালানী ব্যবহারের তুলনায় নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার ২৮ গুণ কম ছিল।

সবদিক বিবেচনায় বিজ্ঞানীরা জানান দিয়েছে, তাদের বেশিরভাগ নির্দেশিকায় নেতিবাচক দিকে যাচ্ছে। তরান্বিত করছে জলবায়ু পরিবর্তন। তবে এরমধ্যেও প্রতিবেদনে প্রকাশ, অবস্থা খুবই গুরুতর। এখনো আশা শেষ হয়ে যায় নি যে কিছু কিছু খাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিলে অনুুমিত ভবিষ্যৎতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন গড়ে তোলা সম্ভব। এটা প্রতিষ্টিত বাস্তবতা যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়াও নদীবিধৌত ব-দ্বীপ বাংলাদেশ আরো প্রাকৃতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। আবার উষ্মায়নের ফলে হিমালয়ের হিমবাহ গলতে থাকায় সমুদ্রপৃষ্টের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়া অব্যাহত আছে। এ প্রাণঘাতী দুর্যোগ ঝুঁকি আরো বাড়ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, খরা, টর্নেডো, ভূমিকম্প, নদী ভাঙ্গন অব্যাহত আছে। জলাবদ্ধতা ও পানি বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততা এদেশের প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এসব দুর্যোগ কোনো না কোনো ভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ১৯৬০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩৩টি সাইক্লোন সংঘটিত হওয়ার তথ্য জানা যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তর ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু করে ২০১৭ সাল থেকে। এর পূর্বে একটা সময় ছিল ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের নামকরণ করা হতো না। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৬০ সাল থেকে ২০০৭ সালে সিডর পর্যন্ত বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়গুলোকে “সিভিয়ার সাইক্লোনিক স্টর্ম” বা প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৭ সালে প্রথম স্পষ্ট সাইক্লোনের নামকরণ করা হয়। ২২৩ কিলোমিটার বেগে ধেয়ে আসা এবং ১৫ থেকে ২০ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছাসে নিয়ে আসা, সেই ঘূর্ণিঝড় ছিল সিডর যাকে, সাইক্লোনিক স্টর্ম উয়থ কোর অব হারিকেন উইন্ডস(সিডর) নাম দেয়া হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ৫টি ঘূর্ণিঝড় হলো ১৯৭০ সালের ঘর্ণিঝড় এবং ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়কে। এরপর দেখা যায়, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সর্বোচ্চ ২৪০ কিলোমিটার ধেয়ে আঘাত আনে প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি ১০ থেকে ৩৩ ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছাসে আঘাত এনেছিল চট্টগ্রামে। যে হিসেব পাওয়া যায় তাতে ১৯৭০ সালের প্রবলতম ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ আদম সন্তান মৃত্যুবরণ করেন। সে সময় ১০ থেকে ৩৩ ফুট উচু জলোচ্ছাস হয়েছিল এবং অসংখ্য গবাদি পশু এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছিল।

সাবেক পরিচালক শাহ আলম বলেন, অনেকে মনে করেন মৃতের সংখ্যা আসলে ৫ লাখেরও অধিক ছিল। তিনি বলেন, ১৯৭০ এর সাইক্লোন থেকে মূলত ঘূর্ণিঝড়ের মনিটরিং শুরু হয়। সেই ঘূর্ণিঝড়টা সরাসরি বরিশালের উঠে এসে ভোলাসহ বাংলাদেশের অনেক এলাকা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এছাড়াও ১৯৮৫ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাপক ফসলের ক্ষয় ক্ষতি হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ১২ থেকে ২২ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছাসের কারণে শতাব্দীর প্রচন্ডতম ঘূর্ণিঝড় আঘাত আনে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। ২৯ থেকে ৩০ এপ্রিলের এ ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানব সন্তান মারা যায়। এছাড়াও কয়েক লাখ পশু ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ ও ধ্বংস হয়। অনেক মাছ ধরার ট্রলার সাগরে ডুবে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

ঘূর্ণিঝড় সিডর ২০০৭ সালে ১৫ নভেম্বর খুলনা বরিশাল উপকূলে আঘাত আনে। ঘূর্ণিঝড় আইলা ২০০৯ সালে ২৫মে পশ্চিমবঙ্গ খুলনা উপকূলীয় এলাকায় আঘাত করেছিল। ১৯৬০ সালের ৩১ অক্টোবরের প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়ে ৫লাখ ১৪৯ জন নিহত হয়। তখন ২০ ফুট উচ্চতার প্রবল জলোচ্ছাসটি ছিল। ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রামে ১ অক্টোবর ২০ থেকে ২২ ফুটের জলোচ্ছাস হয়। ২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় নার্গিস মায়ানমারে আঘাত আনে। ২০১৩ সালে ১৬ মে নোয়াখালি চট্টগ্রাম উপকূলে ঘূর্ণিঝড় মহসিন আঘাত করে। ২০১৫ সালের ৩০ জুলাই চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূলে ৫ থেকে ৭ ফুট ঘূর্ণিঝড় কোমেন আঘাত করে। ২০১৬ সালের ২১ মে বরিশাল চট্টগ্রাম উপকূলে ৪ থেকে ৫ ফুট উচ্চতায় ঘূূর্ণিঘড় রোয়ানু প্রচন্ড আঘাত করে। ২০১৭ সালে ৩০ মে চট্টগ্রাম কক্সবাজার উপকূলে ঘূর্ণিঝড় “মোরা” ব্যাপক আঘাত করে। সূত্র বিবিসি বাংলা। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৯ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আঘাত হানে খুলনা ভোলাসহ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে। তবে বুলবুল যেভাবে বাংলাদেশের উপরে ধেয়ে আসছিল তা থেকে অনেকটা এবারের মতো বেঁচে গেল উপকূলীয় অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষ ও পশুপাখি।

লেখাটি যখন লিখছিলাম তখন বাংলাদেশের আবহাওয়া উগ্র ও উত্তপ্ত ছিল। সারাদেশে বৃষ্টি ভারি বৃষ্টি বৈরী বাতাস চলছিল। যে পরিমাণ ক্ষতির আশংকায় দেশের প্রস্তুতি ছিল সে ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। সংগত কারণে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত জরুরি অবস্থাকে আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। অস্তিত্বের প্রয়োজনে এ সংকটকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। বিরুপ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিশ্বের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাংলাদেশকে কাজ করতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আবহমানকাল থেকে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করে চলেছে। এ অভিজ্ঞতা জলবায়ু পবিবর্তনের প্রভাব ও বিস্তার রোধে যথাযতভাবে কাজে লাগানো। আমাদের দেশ আমাদের পৃথিবী আমাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। এ প্রত্যাশায় জনগণের।

লেখক: মাহমুদুল হক আনসারী
গবেষক, প্রাবন্ধিক

ট্যাগ :