চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১

বাংলাদেশকে হতাশায় পুড়িয়ে উইন্ডিজের রেকর্ড গড়া জয়

প্রকাশ: ২০২১-০২-০৭ ২১:২৫:০৮ || আপডেট: ২০২১-০২-০৭ ২১:২৫:০৮

ডেইলি সিটিজি নিউজ: আক্ষেপ, আফসোস, হতাশা, বিস্ময়! চট্টগ্রাম টেস্টের পঞ্চম ও শেষ দিনের এই চারের সমষ্টিতে ভুগতে হলো বাংলাদেশ দলকে। টেস্ট ক্রিকেটের মাহাত্ম্যটা বুঝালেন ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের দুই অভিষিক্ত ব্যাটসম্যান কাইল মায়ার্স ও এনক্রমাহ বোনার। বাংলাদেশী বোলারদের শাসন করে রেকর্ড গড়েন দুজন। তাতে শোচনীয় পরাজয় টাইগারদের। ৩ উইকেটে ম্যাচ হেরে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ জয়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত থেকে গেল বাংলাদেশ।

শেষদিনের রোমাঞ্চ নিয়ে প্রস্তুত ছিল চট্টগ্রাম টেস্ট। তবে এতোটা রোমাঞ্চও হয়তো আশা করেননি সমর্থকরা। পঞ্চম দিনে জয় তুলে নিতে উইন্ডিজের প্রয়োজন ছিল ২৮৫ রান। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৭ উইকেট। রোববার টেস্টের শেষ দিনে মায়ার্স ৩৭ ও বোনার ১৫ রানে অপরাজিত থেকে ব্যাটিংয়ে নামেন। তাদের আটকানো যেন রীতিমতো দুঃসাধ্য হয়ে পড়লো বাংলাদেশ দলের বোলারদের জন্য।

দিনের শুরুতেই ম্যাচের সবচেয়ে বাজে ডেলিভারিটি করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। যোগ্য জবাব দেন বোনার। দিনটা কেমন হতে চলেছে, তার অভাস পাওয়া যায় তখনই। এদিন টাইগার বোলাররা যতটা সাদামাটা ছিলেন, ততটাই উজ্জ্বল দুই ব্যাটসম্যান বোনার ও মেয়ার্স। এজন্য অবশ্য এই দুই ব্যাটসম্যান কৃতিত্ব দিতে পারেন টাইগার ফিল্ডারদের। ক্যাচ মিসের মহড়া থেকে অধিনায়ক মুমিনুলের রিভিউয়ের সিদ্ধান্ত নিতে অনীহা, সবই পক্ষে গেছে সফরকারী দলের।

৫ দিনের ম্যাচের শেষ দিনে উইকেট থেকে স্পিনাররা যে রকম সাহায্য পান, এদিন তার ফিটেফোটাও ছিল না। মিরাজ, নাঈম, তাইজুলরা শার্প টান পেলেও আলগা বলে ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস খেলার সুযোগ করে দিয়েছেন। সুযোগ কাজে লাগাতে ভুল করেনি মেয়ার্স-বোনার জুটি। দুই ব্যাটসম্যান ২১৬ রানের পার্টনারশিপ গড়ে শুধু ম্যাচের সর্বোচ্চ রানের পার্টনারশিপ গড়েই ক্ষান্ত হননি, সঙ্গে ১৪৪ বছরের টেস্ট ইতিহাসে চতুর্থ ইনিংসে দুই অভিষিক্ত হিসেবে চতুর্থ উইকেটে সর্বোচ্চ রানের জুটি করেন।

দিনের দশম ও উইন্ডিজ ইনিংসের ৫০তম ওভারে ৪৭ রানে থাকা মেয়ার্সকে বিপদে ফেলেছিলেন তাইজুল। উইকেটরক্ষক লিটন দাস দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকায় আম্পায়ারের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাননি মুমিনুল। সাহসী সিদ্ধান্ত নিলে ব্রেক থ্রু আসতো তখনই। ইনিংসের ৫৩ ও ৫৫ নম্বর ওভারে মিরাজের বলে দুটি সুযোগ নষ্ট করেন শান্ত। দ্বিতীয়টি পাশ কাটিয়ে গেলেও প্রথমটি হাত ফসকে বেরিয়ে যায়।

ইনিংসের ৬৮তম ওভারে স্লিপে দাঁড়িয়ে মেয়ার্সকে ফেরানোর আরও একটি সুযোগ পেয়েছিলেন শান্ত। তবে সেটিও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন তিনি। ক্যাচ মিসের প্রতিযোগীতায় রীতিমতো ক্লান্ত হয়ে পড়েন শান্ত। এত এত সুযোগ কাজে লাগাতে ভুল করেননি মেয়ার্স। স্বাগতিক বোলারদের শাসন করে অভিষেক টেস্টেই সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। ১৭৮ বলে শতক হাঁকানো ইনিংসটি ১২টি চার ও একটি ছক্কার মারে সাজান।

প্রথম দুই সেশন রাজত্ব করা উইন্ডিজ তৃতীয় সেশনের শুরুতে খানিক খেই হারিয়ে বসে। শেষ সেশনের শুরুর ওভারেই দিনের প্রথম সাফল্য আসে তাইজুলের হাত ধরে। ৮৬ রানে থাকা বোনারকে ফিরিয়ে লাল-সবুজ শিবিরে স্বস্তি ফেরান এই বাঁহাতি বোলার। খানিক বাদেই ব্ল্যাকউডের উইকেট তুলে নেন নাঈম। চট্টগ্রাম টেস্টের রোমাঞ্চ বাকি তখনো। নতুন ব্যাটসম্যান জশুয়া ডি সিলভাকে নিয়ে ওয়ানডে স্টাইলে ব্যাটিং করতে থাকেন মায়ার্স।

এই ম্যাচে বাংলাদেশ দল ইনজুরিতে পড়া অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে কতটা মিস করেছে সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবুও মাঠে না থেকেও সর্বদা দলের সঙ্গে ছিলেন সাকিব। কখনো অধিনায়ক মুমিনুল, কখনো মিরাজ, কখনো নাঈম-মুস্তাফিজদের পরামর্শ দিতে দেখা যায় তাকে। মাঠে তামিমও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে কিছুতেই ভাগ্য নিজেদের দিকে ফেরাতে পারেনি বাংলাদেশ। টেস্টের আগের চার দিন নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখলেও এদিন ক্যারিবীয়দের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ স্বাগতিক দলের।

সেঞ্চুরিয়ান মায়ার্সকে কিছুতেই থামানো যায়নি। এর আগে এশিয়ার বাইরের অভিষিক্ত ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ৪র্থ ইনিংসে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ছিল উসমান খাজার, তার ১৪১ রানের ইনিংসটি টপকে ২৬১ বলে ১৫০ রানের কোটা পূর্ণ করেন মায়ার্স। সেটিকে পরে ডাবল হান্ড্রেডে রূপ দেন তিনি। বিশ্বের ষষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকে দ্বিশত করার নজির গড়েন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। শেষপর্যন্ত ২১০ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ২৩০ বলের ইনিংসটি মায়ার্স সাজিয়েছেন ২০চার ও ৭টি ছয়ের মারে।

টেস্টে সর্বোচ্চ রান টপকিয়ে জয়ের রেকর্ডে সবার উপরে উইন্ডিজ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৪১৮ রান তাড়া করে জিতেছিল তারা। এবার ক্যারিবীয়দের সামনে লক্ষ্য ছিল ৩৯৫ রান। বাংলাদেশের মাটিতে এর আগে সর্বোচ্চ রান টপকানোর রেকর্ড গড়েছিল নিউজিল্যান্ড। ৩১৭ রান টপকিয়ে ৩ উইকেটে জয় পেয়েছিল কিউইরা। এই ম্যাচে জয় পেতে গেলে রীতিমতো রেকর্ড গড়তে হতো উইন্ডিজকে। সেটিই করা দেখাল ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটের দল। মায়ার্সের কল্যাণে শেষদিনের খেলার ১৫ বল বাকি থাকতে ৩ উইকেটে জয় তুলে নিয়েছে উইন্ডিজ।

শেষদিকে অবশ্য খানিক ভীতি ছড়িয়েছিলেন মিরাজ-নাঈমরা। তবে জশুয়া ২০ ও কেমার রোচ শূন্য রানে ফিরলেও খুব বেশি বিপাকে পড়তে হয়নি ক্যারিবীয়দের। বাংলাদেশের হয়ে আগের ইনিংসের মতো এই ইনিংসেও ৪ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি মিরাজ।

এই ম্যাচ হারের ফলে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের জয়ের দেখা অধরায় থেকে গেল টাইগারদের। আগের ৩ টেস্টের সঙ্গে পরাজয়ের খাতায় যুক্ত হলো উইন্ডিজের বিপক্ষে এই চট্টগ্রাম টেস্ট। সিরিজে সমতায় ফেরানোর মিশনে আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি ২ ম্যাচ টেস্ট সিরিজের শেষ ম্যাচে ক্যারিবীয়দের মুখোমুখি হবে টাইগাররা।

সংক্ষিপ্ত স্কোর-

বাংলাদেশ: ৪৩০ ও ২২৩/৮ ডিক্লে. (মুমিনুল ১১৫, লিটন ৬৮ মুশফিক ১৮; কর্নওয়েল ৩/৮১)
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ২৫৯ ও ৩৯৫/৭ (মায়ার্স ২১০*, বোনার ৮৬; মিরাজ ৪/১১৩)

ট্যাগ :