চট্টগ্রাম, , মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১

ভোট উৎসবের অপেক্ষায় রংপুর 

প্রকাশ: ২০১৭-১২-২০ ১৯:০১:০৫ || আপডেট: ২০১৭-১২-২০ ১৯:০১:০৫

 সিটিজি নিউজ ডেস্ক: 

তিন সপ্তাহের প্রচার আর তার চেয়ে বেশি সময়ের আলোচনা শেষে উত্তরের সর্ব উত্তরের বিভাগীয় শহর রংপুরে এখন ভোটের অপেক্ষা। সিটি করপোরেশন পরিচালনায় প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রস্তুত এলাকাবাসীও।

বৃহস্পতিবার সকাল আটটায় শুরু হয়ে ভোট বিরতিহীনভাবে চলবে বিকেল চারটা পর্যন্ত। আগের দিন বুধবার বিকেলের মধ্যে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ।

ভোটের পরিবেশ নিয়ে প্রধানত বিএনপির পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ থাকলেও আওয়ামী লীগ বা জাতীয় পার্টির তেমন কোনো অভিযোগ নেই নির্বাচন নিয়ে। নির্বাচন কমিশনও এখানে শান্তিপূর্ণ এবং সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

বুধবার সকালে রংপুর পুলিশ লাইন্স স্কুল মাঠে নির্বাচনী উপকরণ বিতরণের আগে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করবেন এমন পুলিশ কর্মকর্তা, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ানের সদস্য এবং আনসার সদস্যদের সাথে কথা বলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক। তিনি তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেন, নির্বাচন হবে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য। কোন কর্মকর্তা, পুলিশ বা আনসার সদেস্যর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, ‘আপনারা নিরপত্তাহীনতায় ভুগবেন না। আমরা প্রশাসনকে এমনভাবে সাজিয়েছি যে ফোন করা মাত্রই পাঁচ মিনিটের মধ্যে হয় পুলিশ, না হয় র‌্যাব অথবা বিজিবি সদস্যরা আপনার কাছে পৌঁছবে। সুতরাং কারও হুমকিতে নতজানু হওয়া যাবে না।’

এ সময় রংপুরের আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার বলেন, ‘এটি একটি চ্যালেঞ্জের নির্বাচন। আমরা অবাধ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাই। ’

স্থানীয় এই নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হওয়ায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে রংপুর জুড়ে। উৎসবের এই ভোটে যাতে কোন প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে জন্য নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা।

৩৩ টি ওয়ার্ডে তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন ভোটার রয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ৯৭ হাজার ৬৩৮ জন নারী ও এক লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৬ জন পুরুষ। ভোট কেন্দ্র ১৯৩টি। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে প্রিজাইটিং কর্মকর্তা ছাড়াও প্রতিটি বুথে একজন করে মোট এক হাজার ২২২ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা থাকবেন।

২০১২ সালে প্রথম সিটির নির্বাচনে চারটি কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম দিয়ে ভোট নেয়া হয়েছিল। এবার ইভিএম থাকছে একটি কেন্দ্রে। রংপুর বেগম রোকেয়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে ভোট নেয়া হবে ইভিএম দিয়ে। তবে কোন প্রকার যান্ত্রিক ত্রুটি হলে স্বভাবিক পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণের প্রস্তুতিও আছে।

১৯৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ১০৮টি কেন্দ্রই গুরুত্বপূর্ণ বা ঝুঁকিপুর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ওই সব কেন্দ্রে গত দুইদিন থেকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে ভোটকে ঘিরে ‘চার স্তরের নিরাপত্তা’য় কাজ করছে ২১ প্লাটুন বিজিবি। সিটির ৩৩টি ওয়ার্ডে ৩৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া আরো ছয় জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবেন।

কমিশন জানিয়েছে, প্রতিটি ওয়ার্ডেই একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন। প্রতিটি কেন্দ্রে একজন প্রিজাইটিং কর্মকর্তা ছাড়াও একজন সহকারী প্রিজাইটিং কর্মকর্তা এবং ১০ জন পুলিশ ও ১৪ জন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবেন।

সাত মেয়র, ৬৫ জন সংরক্ষিত কাউন্সিলর প্রার্থীসহ ২৮৩ জন প্রার্থী আলোচিত এই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন। নির্বাচনে মেয়র পদে মোট ১৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু যাচাই বাচাই শেষে বৈধ মেয়র প্রার্থী পদে সাতজনকে ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।

কে হচ্ছেন মেয়র
রংপুর সিটি করপোরেশনে ২০১২ সালের প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমদ ঝন্টু এক লাখ ৬ হাজার ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দী জাতীয় পার্টির নেতা মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা পান ৭৭ হাজার ৮০৫ ভোট। আর বিএনপির প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা সেনা মোতায়েন না করার অজুহাতে ভোটের আগের রাতে সরে দাঁড়ান। এবারও তিন প্রার্থী ভোটের লড়াইয়ে রয়েছেন।

তবে গত নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনের আমেজ অন্য রকম। কারণ, গত নির্বাচন হয়েছিল নির্দলীয়ভাবে। দল প্রার্থীকে সমর্থন দিলেও তারা দলের প্রতীক পাননি। কিন্তু এবার ভোট হচ্ছে দলের প্রতীকেই। তাই এবারের নির্বাচন মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির জন্য।

এমনিতে রংপুর জাতীয় পার্টির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তার ওপর দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নিজ এলাকায় হচ্ছে ভোট। তাই এখানে হারতে চায় না সংসদে বিরোধী দলটি। আর বর্তমান সরকারের আট বছরে দেশে ব্যাপক উন্নয়নের দাবি করে যাওয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও দেখিয়ে দিতে চায়, জনসমর্থন তাদের পক্ষেই। অন্যদিকে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি দাবি করছে তারাই এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। তারাও চাইছে এই দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে।

এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএপির কেন্দ্রীয় নেতারা রংপুরে এসে তাদের প্রার্থীর হয়ে প্রচার চালিয়ে গেছেন। আহ্বান জানিয়েছেন যথাক্রমে নৌকা ও ধানের শীষে ভোট দেয়ার। আর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এখন রংপুরেই অবস্থান করছেন। তিনি এখানকারই ভোটার। তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ায় নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারছেন না।

রংপুরে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসীল ঘোষণার পর থেকেই চলছে নানা সমীকরণ। মেয়র পদে কে জিতবেন এ নিয়েই যত আলোচনা। চলছে নানা জল্পনা কল্পনা।

নির্বাচনে মেয়র পদে সাত জন প্রার্থী লগাই করলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন আওয়ামী লীগের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু, বিএনপির কাওসার জামান বাবলা আর জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা। তিন প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকরাই জয়ের প্রত্যাশায় রয়েছেন। তারা খোলাখুলি বলছেনও তা।

আওয়ামী লীগের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝণ্টু বলেন, ‘পাঁচ বছর মেয়র থাকাকালে আমি এই এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। জনগণ এর মূল্যায়ন করবে এবং আমাকেই আবার ভোট দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’

২০১২ সালের ভোটে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেছেন, ‘গতবার দলের মধ্যে বিভেদের কারণে আমি হেরেছি। কিন্তু এবার আমার পক্ষে এলাকায় জনজোয়ার তৈরি হয়েছে। আমিই জিতব।’

আর বিএনপির কাওসার জামান বাবলা বলেন, ‘বর্তমান সরকারের অত্যাচার, নির্যাতনের জবাব দিতে জনগণ প্রস্তুত আছে। তারা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারলে বিএনপিকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে।’

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিটি করপোরেশন
১৮৬৯ সালের ১ মে ৫০ দশমিক ৬৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠন হয় রংপুর পৌরসভা। প্রথম চেয়ারম্যান হন রংপুরের তৎকালীন কালেক্টর ই জি গেন্ডজিয়ার। আর পৌরসভার শেষ মেয়র ছিলেন এ কে এম আব্দুর রউফ মানিক।
২০১২ সালে পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয়। যার বর্তমান আয়তন ২০৫ বর্গ কিলোমিটার। পৌরসভায় ১৫টি ওয়ার্ড থাকলেও সিটি করপোরেশনে এই সংখ্যা এখন ৩৩টি। আগের ১২টি ইউনিয়ন এতে যুক্ত হয়েছে।

ট্যাগ :