চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ১৩ মে ২০২১

প্রতিবন্ধীরা সমাজেরই অংশ

প্রকাশ: ২০১৭-১২-২৯ ০৫:২৯:২০ || আপডেট: ২০১৭-১২-২৯ ০৫:৩৪:০৩

Publish 2017-12-29  11:30:21

 

অটিজম কোনো মানসিক রোগ বা মানসিক প্রতিবন্ধিতা নয়। তবে সমাজে এর ব্যাপকতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এটি মূলত শিশুদের মস্ত্মিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশজনিত একটি সমস্যা, যা তার সামাজিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করে। এর অন্য নাম অটিজম স্পেকট্রাম সিনড্রোম (এএসডি)। বিজ্ঞানীরা স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশজনিত সমস্যা হিসেবে উলেস্নখ করেছেন। অটিজমে মস্ত্মিষ্কের গঠনতন্ত্রে বিশেষ কোনো পার্থক্য থাকে না, কিন্তু এর চিন্ত্মাধারা ও কার্যাবলি ভিন্ন ধারায় ও ভিন্ন খাতে পরিচালিত হয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ আইনে তাদের শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত, ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ত্মতা ও প্রতিকূলতার ভিন্নতা বিবেচনায়, প্রতিবন্ধিতার বেশ কয়েকটি ধরন রয়েছে। অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারস, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, মানসিক অসুস্থতাজনিত প্রতিবন্ধিতা, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, বাকপ্রতিবন্ধিতা, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণপ্রতিবন্ধিতা, শ্রবণ-দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, সেরিব্রাল পালসি, ডাউন সিনড্রোম, বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা, অন্যান্য প্রতিবন্ধিতাসহ মোট ১২ ধরনের প্রতিবন্ধিতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে দেশের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচি অনুযায়ী, দেশে মোট প্রতিবন্ধী ১৫ লাখ ৯ হাজার ৭১৬ জন। এর মধ্যে ৪৫ হাজার ৪০৪ জন হচ্ছে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের (সিআরসি) ২৩ ধারা অনুযায়ী, অন্যান্য স্বাভাবিক শিশুর মতো প্রতিবন্ধী শিশুরাও সমঅধিকার ও সমসুযোগ পাওয়ার অধিকারী।

 

২০০৬ সালের ১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক একটি সনদ (সিআরডিপি) গৃহীত হয়। এ সনদ ২০০৮ সালের ৩ মে থেকে কার্যকর হয়। সিআরসি ও সিআরপিডি সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশু যেন কোনো ধরনের বৈষম্য ছাড়াই তাদের অধিকার ভোগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করবে। এই দুটি সনদে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। জাতীয় শিশু নীতিমালাতেও প্রতিবন্ধী শিশুসহ সব শিশুর অধিকার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্ত্মবতা ভিন্ন। প্রতিবন্ধীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। তাদের মেধার বিকাশে যথেষ্ট উদ্যোগ নেই। প্রতিবন্ধীদের দিয়ে কিছুই হবে না- এই ভেবে তাদের বাতিলের খাতায় ফেলে রাখা হয়। এমনকি নিজ পরিবারেও প্রতিবন্ধী শিশুরা নিগৃহীত হয়। তাদের বোঝা মনে করা হয়। জীবনের প্রতি পদে তারা অবহেলার শিকার হয়।
জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে জোর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১-এও প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাসেবা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার পরও শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের অংশগ্রহণ খুবই কম।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল (ইউনিসেফ) তার বিশ্ব শিশু পরিস্থিতি ২০১৩ প্রতিবেদনে প্রতিবন্ধী শিশুদের উন্নয়নে কয়েকটি সুপারিশ করেছে। সুপারিশগুলো হচ্ছে- প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সনদ ও শিশু অধিকার সনদ অনুমোদন ও বাস্ত্মবায়ন করতে হবে। বৈষম্যের বিরম্নদ্ধে লড়াই করতে হবে। সাধারণ মানুষ, নীতিনির্ধারক এবং শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সুরক্ষার মতো জরম্নরি সেবা যারা দিয়ে থাকেন, তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
অটিস্টিক শিশুদের সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল আন্ত্মর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছেন। এ স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে দেশের জন্য গৌরব বয়ে এনেছে। শিশুদের অটিজম এবং স্নায়ুবিক জটিলতাসংক্রান্ত্ম বিষয়ে ২০০৮ সাল থেকে কাজ শুরম্ন করেন সায়মা ওয়াজেদ। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে প্রশংসা অর্জন করে তার কাজ। তার উদ্যোগেই ২০১১ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় অটিজম নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আন্ত্মর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনের পরে গড়ে ওঠে সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক। বলা যায়, তার উদ্যোগেই অটিজম সচেতনতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্বাহী পরিষদে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয় বাংলাদেশের একটি প্রস্ত্মাব।
২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাকে ‘এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওয়ার্ড’ পদকে ভূষিত করে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটিজম স্পিকসের পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। ২০১৩ সালের জুনে তিনি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেলের অন্ত্মর্ভুক্ত হন।
সায়মা ওয়াজেদ দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কন্যা হিসেবে নয়, স্বীয় যোগ্যতা ও কর্মগুণেই এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন। অভিনন্দন সায়মা ওয়াজেদকে। তার এই আন্ত্মর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। এতে সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে অটিজম বিষয়ে জাতীয় ও আন্ত্মর্জাতিক পর্যায়ে যেসব কাজ করেছে, তা গর্ব করার মতো। অটিজম রয়েছে এমন শিশুদের মধ্যে ১০ থেকে ২০ শতাংশ চার থেকে ছয় বছর বয়সের মধ্যে মোটামুটি সুস্থ হয়ে ওঠে এবং সাধারণ স্কুলে স্বাভাবিক শিশুদের সঙ্গে পড়ালেখা করতে পারে। আরও দরকার তাদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করা। দেখা গেছে, মেধা বিকাশের সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধীরা সমাজকে অনেক কিছু দিতে পারে। আন্ত্মর্জাতিক পর্যায়ে অটিস্টিক শিশুদের বাংলাদেশের হয়ে পদক জেতার ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পৃথিবীর বিখ্যাত কয়েকজন বিজ্ঞানী এবং মনীষী জন্মগতভাবে প্রতিবন্ধী হলেও স্বীয় প্রতিভাগুণে বিশ্ববরেণ্য হয়েছেন- এমন দৃষ্টান্ত্মও আমাদের সামনে রয়েছে। সঠিক প্রশিক্ষণ, সমন্বিত সেবা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ এবং সামর্থ্যবান প্রতিটি ব্যক্তি ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে অটিস্টিকসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধীর পাশে দাঁড়াবে- এটাই প্রত্যাশা।

ডক্টর শেখ সালাহ্‌উদ্দিন আহ্‌মেদ 

ট্যাগ :