চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

চিকিৎসা প্রাপ্তি সহজতর করতে হবে

প্রকাশ: ২০১৯-০৭-০৬ ১৬:১০:৩৩ || আপডেট: ২০১৯-০৭-০৬ ১৬:১০:৩৩

সুস্থ জাতি, সুস্থ দেশ উন্নয়নের পূর্বশর্ত। নাগরিককে স্বাস্থ্যসেবায় অবশ্যই চিকিৎসাকে সমস্ত নাগরিকের জন্য সহজতর করা চায়। জনগণের জন্য দেশ দেশের জন্য সুস্থ সবল নাগরিক প্রয়োজন। দেশকে স্বনির্ভর করতে হলে সুস্থ নাগরিকের বিকল্প নেই। অন্যান্য নাগরিক সুবিধার সাথে চিকিৎসা সুবিধা জনগণের মৌলিক অধিকার। ক্ষমতাসীন সরকারকে নাগরিকের চিকিৎসাসেবা সার্বজনীন ও সহজলভ্য করতে হবে।

দেশে সরকারি বেসরকারিভাবে অনেক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান আছে, এবং নতুনভাবে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্টা হচ্ছে। উন্নত, আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা এখনো দেশে জনগণের নাগালের মধ্যে আসে নি। চিকিৎসাখাত এখনো সেবা হিসেবে বাংলাদেশে জনগণ দেখছে না। এ খাতকে জনগণ সেবা হিসেবে পাচ্ছে না। রাজধানী থেকে দেশের সবগুলো বড় বড় শহর গ্রামে সরকারি হাসপাতাল পাওয়া গেলেও চিকিৎসায় জনগণ আশানুরূপ ফল পাচ্ছে না। সবগুলো সরকারি ও আধা সরকারি হাসপাতালে রোগিদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও সে অনুপাতে রোগিগণ সেবা পাচ্ছে না। কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ সরকারি হাসপাতালে রোগের সঠিকভাবে চিকিৎসা দিয়ে রোগিকে আত্মতৃপ্তি দিতে পারছে না। বিশেষজ্ঞ একজন চিকিৎসক যিনি সরকারি হাসপাতালে রোগিদের ফ্রি চিকিৎসা দেন, তিনি সেখানে রোগের রোগিকে সঠিকভাবে আরোগ্য করে তোলার মতো চিকিৎসা না দিয়ে তার চেম্বারমুখী করছে রোগিকে। রোগি চেম্বারে গেলে ওই ডাক্তার রোগিকে মোটা অঙ্কের ফি’র বিনিময়ে ভালোভাবে প্রেসক্রাইব করে মোটামুটি রোগির আস্থা অর্জন করতে দেখছি। কিছুটা হলেও প্রাইভেট চিকিৎসায় রোগি আরোগ্যতার ফল পাচ্ছে। কিন্তু সরকারি হাসপাতালে রোগিকে সেভাবে চিকিৎসা দিচ্ছে না কর্তব্যরত ডাক্তারগণ।

দেখা যায়, অনেক সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে রোগিকে শুধুমাত্র জ্বর, বাত ব্যাধির ওষুধ দিয়ে ডাক্তারি সেবা শেষ করে দেয়। রোগির জটিল ও কঠিন রোগের কোনো প্রেসক্রাইব এসব হাসপাতালে দেয়া হয় না। অর্থাৎ সর্বোচ্চ প্রাথমিক চিকিৎসা দেশের আনাচে কানাচে প্রতিষ্ঠিত সরকারি ও বেসরকারি কতিপয় হাসপাতালে জনগণ পেয়ে থাকে। উন্নত আধুনিক চিকিৎসা পেতে হলে একজন রোগিকে প্রাইভেট ডাক্তার অথবা প্রাইভেট ক্লিনিকে শরণাপন্ন হতে হয়।

বাংলাদেশের সবশ্রেণীর মানুষের পক্ষে প্রাইভেট চিকিৎসা গ্রহণ করা কঠিন বিষয়। প্রইভেট চিকিৎসায় ডাক্তারের ফি, নানাবিধ পরিক্ষা-নিরীক্ষা করতে একজন নাগরিকের প্রাথমিকভাবে কয়েক হাজার টাকার দরকার। বাংলাদেশের গ্রাম গঞ্জের কয়জন কৃষক ও দিনমজুরের পক্ষে এতো টাকা জোগাড় করে চিকিৎসা নেয়া কখনো সম্ভব হয়ে উঠে না। ধার কর্জ করে যারা চিকিৎসা গ্রহণ করতে উপজেলা ও জেলা শহরে পাড়ি জমায় তাদের প্রচুর অর্থ খরচ হয়। কতিপয় ডাক্তারের অপচিকিৎসায় অর্থের সাথে অহেতুক ভোগান্তির শেষ থাকে না। প্রয়োজন অপ্রয়োজনে নানা পরিক্ষা নিরীক্ষায় রোগির অর্থ ও ভোগান্তি অনেক সময় চরম পর্যায় পৌঁছে। তবুও রোগের মুক্তি পাওয়ার আশায় চিকিৎসকের ধারে ধারে দৌড়াতে দৌড়াতে একসময় রোগি অর্থ আর জীবন দু’টোই শেষ হয়ে যায়।

চিকিৎসক রোগ বুঝোক আর না বুঝোক রোগিকে কিছুই বলে না। ফলে রোগির মৃত্যু কখনো অনিবার্য হয়ে পড়ে। যাদের আর্থিক সামর্থ্য থাকে তারা দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য চলে যায়। সেক্ষেত্রে দেশের লাখ লাখ টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমাদের দেশের চিকিৎসা ও চিকিৎসক এখনো জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারে নি। চিকিৎসা ও প্রেসক্রাইব সঠিক হলেও নির্দিষ্ট মানসম্পন্ন ওষুধের অভাবে রোগি ভালো হচ্ছে না।

দেশে যে সংখ্যক ওষুধ কোম্পানী আছে, তন্মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানী ছাড়া বাকি কোম্পানীগুলো ওষুধের মান রক্ষা করছে না বলে অভিযোগ আছে। তারপরও ওষুধ কোম্পানীর দাপট ও বেপরোয়া বাণিজ্য চলছে রেগিদের নিয়ে। এসব কোম্পানী তাদের এমআর ও এজেন্টের মাধ্যমে ডাক্তারদের ভিজিট করে তাদের ওষুধ প্রেসক্রাইব করার জন্য ডাক্তারদের উদ্বুদ্ধ করে। দেশের সব জায়গায় ওষুধ কোম্পানীর এমআরদের অপতৎপরতার শেষ নেই।

বহু হাসপাতালের পরিচালক কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ ওইসব এমআরদের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও এমআররা তা মানতে দেখা যায় না। চেম্বারের বাইরে দাড়িয়ে থেকে ডাক্তার ও রোগিদের চিকিৎসা কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এসব কার্যক্রম নিত্য নৈমিত্তিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে জনগণ অবলোকন করছে। তবুও তাদের অনৈতিক এসব অপতৎপরতা বন্ধ হচ্ছে না। কতিপয় ডাক্তারের প্ররোচনায় এসব কোম্পানী ও এমআর টিকে আছে। নিম্ন মানের কোম্পানী ওষুধ ও তাদের নিয়ন্ত্রণে কতিপয় হাসপাতাল চিকিৎসার নামে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলছে। মূলত ওইসব প্রতিষ্টান ও নিম্ন মানের মেডিসিনের উৎপাদন বাজারজাত থাকার ফলে চিকিৎসা ও রোগিদের কঠিন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

কয়েকদিন পূর্বে পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় ঢাকার শতকরা ৯৩ ফার্মেসিতে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধের মজুদ পাওয়া যায়। রাজধানীর চিত্র এ ধরনের। তাহলে রাজধানীর বাইরের চিত্র নিশ্চয় আরো করুণ ও ভয়াবহ। মাঝে মধ্যে প্রশাসন ভেজাল ওষুধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ খুঁজতে মাটে নামে। তখন দেখা যায় কী পরিমাণ দুর্নীতি এসব খাতে হচ্ছে। তাহলে জনগণের চিকিৎসা কীভাবে আদর্শ চিকিৎসা হিসেবে মিলবে সেটা এক দুষ্প্রাপ্য বিষয় ছাড়া কিছুই না। এ ধরনের অনৈতিক অমানবিক জাতি বিধ্বংসী কর্মকান্ড থেকে বিরত না হলে, সুস্থ জাতি হিসেবে সমাজ ও রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

সরকারের চিকিৎসা সেবা জনগণের নাগালের মধ্যে পৌঁছাতে যেভাবেই হোক অনেক চেষ্টা আর প্রচেষ্টা দেখা গেলেও বাস্তবে তার সুফল জনগণ পাচ্ছে বলে দেখছি না। বেসরকারি খাতে প্রতিদিন অসংখ্য হাসপাতাল তৈরী হচ্ছে। তাদেরও জনগণকে উচ্ছাসিত করার মতো বক্তব্য বিজ্ঞাপন দেখছি। বাস্তবে জনগণ কী পরিমাণ সরকারি বেসরকারি চিকিৎসা খাত থেকে সেবা পাবে সেখানেই জনগণের অসংখ্য প্রশ্ন। বাস্তবে চিকিৎসা অর্থেই টাকার খেলা। টাকা ছাড়া কোনো চিকিৎসা নেই। নেই কোনো মেডিসিন ও ল্যাব্রটরির পরিক্ষা নিরীক্ষা। যার অর্থ আছে তার চিকিৎসা ও বেঁচে থাকার কিছুটা হলেও সুযোগ থাকে। আর যাদের অর্থ সামর্থ্য নেই তাদের চিকিৎসা সরকারিভাবে হোক বেসরকারিভাবেও প্রশ্নই আসে না। তাহলে সরকারি এতগুলো রাষ্ট্রীয় হাসপাতালের মাধ্যমে জনগণ কী পরিমাণ চিকিৎসা পাচ্ছে সেটা রাষ্ট্রকে গভীরভাবে খোঁজ খবর রাখা দরকার। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আধুনিক ও জটিল কঠিন রোগের চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। সরকারি বেসরকারি খাতে প্রতিষ্ঠিত সবগুলো চিকিৎসা কেন্দ্রে দুস্থ মানুষের চিকিৎসার দ্বার প্রশস্ত করতে হবে। কারণ সামর্থ্যবান মানুষের চিকিৎসা অর্থের বিনিময়ে দেশে ও বিদেশে পাওয়া যায়। কিন্তু গরিব অসামর্থ্য মানুষগুলো অর্থাভাবে চিকিৎসা নিতে না পারায় ধুকে ধুকে মৃত্যু শয্যায় ধাবিত হয়। তাদের জন্য বলছি রাষ্ট্রকে ও সমাজের সামর্থ্যবান ব্যাক্তি ও প্রতিষ্টানকে এগিয়ে আসতে। তবেই দেশের চিকিৎসক, হাসপাতাল যত বাড়বে ততই সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া সহজলভ্য হবে। চিন্তা চেতনায় অসহায় মানুষের উন্নত চিকিৎসা প্রাপ্তি প্রতিষ্টা করাই হোক চিকিৎসা খাতের উদ্দেশ্য।

লেখক: মাহমুদুল হক আনসারী
গবেষক, প্রাবন্ধিক

ট্যাগ :