চট্টগ্রাম, , বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

সকল ঈদের সেরা ঈদ-ঈদে মিলাদুন্নবী (সাঃ)

প্রকাশ: ২০১৯-১১-০৫ ১৫:১১:১২ || আপডেট: ২০১৯-১১-০৫ ১৫:১১:১২

শাহছুফী আলহাজ্ব হযরত মাওলানা ছৈয়দ আখতার কামাল শাহ্ (মাঃ জিঃ আঃ) : কালাল্লাহু তা’য়ালা ফি কালামিহিল মাজীদঃ- ইন্নাল্লাহা ওয়া মালাইকাতাহু ইউছালুনা আলান নবী। ইয়া আইয়্যুহাল্লাযিনা আমানুছ্লু আলাইহে ওয়া ছালে­মু তাছলিমা”।

অর্থঃ নিশ্চয় আমি আল্লাহ আমার ফেরেশতাদেরকে নিয়ে আমার পেয়ারা হাবীবের উপর দরুদ ও ছালাম পেশ করিতেছি। ওহে ঈমানদারগণ-তোমরাও আমার বন্ধুর উপর দরুদ ও ছালাম পেশ কর” (আল কুরআন)।

পৃথিবীর বুকে যখন আধাঁর যুগ নামিয়া আসিয়াছিল তখন আরব, মিসর, রোম, পারস্য, চীন, ভারতসহ প্রভৃতি দেশে সত্যের আলো নিভিয়া গিয়াছিল। স্রষ্টাকে ভুলিয়া মানুষ নিজেদের সৃষ্ট বস্তু, প্রকৃতিও দেব-দেবতাদের প্রতিমার নিকটে মাথানত করিতেছিল। হানা-হানি, রক্তপাত, নারী বলিদান সহ হেন কোন অপকর্ম ছিল না যাহা তারা করিতোনা। তৌহিদ বা একত্ববাদ জগৎ হইতে প্রায় লুপ্ত হইয়া গিয়েছিল। মানবজাতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত। অশান্তির দাবানল চতুর্দিকে দাউ দাউ করে জ্বলছে। শান্তির প্রতিকূল অবস্থা থেকে অনুকূলে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন ছিল একজন মহা-মানবের আবির্ভাব। জ্বিন, ইনছান, ফেরেশতাসহ তামাম সৃষ্টির ফরিয়াদ হে মহান আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন”। এইরূপ অবস্থার বহুবছর পূর্বে ছৈয়্যেদেনা ইব্রাহীম (আঃ) ও ছৈয়্যেদেনা হযরত ইসমাইল (আঃ) পিতাপুত্র কাবাঘর নির্মাণ শেষে আল্লাহর নিকট এইভাবে দোয়া করেছিলেন- হে আমাদের রব, আমাদের বংশদিগের মধ্যহতে একজন রাসূল (সাঃ) প্রেরণ করুণ, যিনি তাদের নিকটে আপনার বানী প্রচার করিবেন এবং কিতাব শিক্ষা দিবেন, জ্ঞান দান করিবেন এবং তাহাদিগকে শুদ্ধ করিবেন। নিশ্চয় আপনি পরাক্রমশালী এবং পরম জ্ঞানী” (ছুরাহ্ বাকারা)।

অসীম দয়ালু, রহমানুর রহিম মহান আল্লাহর দয়ার সাগরে প্রেমের ঢেউ উথলিতে লাগিল। আল্লাহপাক স্বীয় কুদরতি কায়দায় সৃষ্টিতে লীলা করার পূর্ণপরিকল্পিত পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য তাঁহার প্রতিশ্র“তি মকামে মাহমুদে সংরক্ষিত, সর্বপ্রথম ও সর্বশেষ পয়গম্বরকে পৃথিবীর মাঝে প্রেরণ করার যাবতীয় কুদরী, অদৃশ্য প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করিলেন। হযরত আদম (আঃ) থেকে ঈসা (আঃ) পর্যন্ত সকল পয়গম্বর এবং তত্ত্বদর্শী মহাপুরুষগণ প্রত্যেকেই হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর আগমন সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করিয়া গিয়াছেন। তাই তিনি আল্লাহ পাকের প্রতিশ্রুতি পয়গম্বর। হুজুর (সাঃ) ফরমাইয়াছেন- আউয়ালু মা খালাকাল্লাহু নূরী” অর্থাৎ আল্লাহ পাক যাহা সৃষ্টি করেছেন সর্বপ্রথম সৃষ্টি করেন আমার নূর। অতএব, এই কথা অনায়াসে বলা যায় যে, পিয়ারা নবী (সাঃ) পৃথিবীতে আগমনের অনেক পূর্বে জন্ম নিয়েছিলেন। সুতরাং সমস্ত সৃষ্টি তাহারই নূর থেকে সৃষ্টি হয়েছে। তাই পৃথিবীতে তাহার আগমন হবে অস্বাভাবিক নিয়মে, কুদরতুল্লাহর কুদরীর মাধ্যমে। আজ তাঁহার আগমনের অপেক্ষায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষিত সবাই। চন্দ্র-সূর্য্যে, গ্রহ-নক্ষত্রে, পাহাড়-পর্বতে, সাগর-নদীতে, জ্বীণ-ইনছানে, ফুলে-ফলে, হুরে-নূরে, ফেরেশতাকুলে তাহার ধ্যান মূর্তি একটা অস্পষ্ট ছায়া ফেলিয়াছে। বিশ্ব-প্রকৃতির অন্তর জুড়িয়া তাই এক পরম কৌতুহল ও জিজ্ঞাসা জাগিয়াছে, কোথায়, কবে, কোনখানে, কীভাবে, রহমতে দো আলম নবী আত্মা প্রকাশ করিবেন। ৫৭০ খৃষ্টাব্দের ২৯ আগষ্ট মোতাবেক ১২ই রবিউল আউয়াল, রোজ সোমবার সুবহে সাদিকের পূর্ব আকাশ রাঙ্গা হইয়া উঠিয়াছে। আরবের মরু দিগন্তে মক্কা নগরীর স্বর্গীয় এক কুঠিরে মহীয়সি রমনী মা আমিনা দেখিতে ছিলেন- এক অপূর্ব নূরে আসমান-জমিন আলোকিত হইয়া গিয়াছে। সেই আলোতে চন্দ্র-সূর্য্য, গ্রহ-তারা ঝলমল করিতেছে। কার যেন আজ শুভাগমন কার যেন আজ অভিনন্দন, যুগ-যুগান্তরের প্রতিক্ষীত সেই না আসা অতিথির আগম মুহুর্ত আজ যেন আসন্ন হইয়া উঠিয়াছে। তাহারই অভ্যর্থনার জন্য আজ যেন ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে কুল মাখলুকাত। আজ সেই আনন্দে সবাই আত্মহারা। আসমান জমিনে ফেরেশতারা ছোটাছোটি করিতেছে। তোরণে-তোরণে বাঁশি বাজিতেছে। সবাই আজ বিস্মিত, পুলকিত, কম্পিত, শিহরিত। খসরুর রাজপ্রাসাদের স্বর্ণচূড়া ভাঙ্গিয়া পড়িয়াছে। কাবাঘরের রক্ষিত দেবমূর্তিগুলো ভুলুন্ঠিত হইয়াছে। সিরিয়ার বিখ্যাত মরুভূমিতে পানির নহর বহিতেছে, মা আমিনার গৃহে কী অপরূপ দৃশ্য। হযরত বিবি হাওয়া, বিবি রহিমা, বিবি হাজেরা, বিবি মরিয়াম সবাই তাহার শিয়রে দন্ডায়মান। বেহেশতি নূরে সমস্ত ঘর আলোকিত। খুশবুতে বাতাস আজ সুরভিত। এক স্নিন্ধ পবিত্র চেতনার পর মা আমিনা চোখ মেলিয়া চাহিয়া দেখিলেন- কোলে তাহার পূর্ণিমার চাঁদ হাসিতেছে। সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত সৃষ্টির অন্তর ভেদিয়া ঝকৃত হইল মহানন্দ ধ্বনিঃ- মারহাবা ইয়া রাসূলুল্লাহ, মারহাবা ইয়া হাবীবাল্লাহ। কবিগণ গায়িগা উঠিল: আজ আরশে আসলেন মোদের নবী কামলিওয়ালা, যাহারা পরশে ত্রিভূবন আজ হলো মাতোয়ারা” বেহেশতের কানন হতে হুরপরীগণ পুষ্পবৃষ্টি করিতে লাগিল” বেহেস্তি পোশাক পরিধান করিয়া দিলো তাহারা। অনন্ত আকাশে বাতাসে গ্রহে নক্ষত্রে ফেরেশতাগণ তছলিম জানাইতে লাগিল। যাহার আগমন অপেক্ষায় যুগ-যুগান্তর ধরিয়া কুল মাখলুকাত অধীর আগ্রহে প্রহর গুণিতে ছিল, তিনি আজ মানব ছুরতে আমাদের মাঝে রহমত স্বরূপ উপস্থিত। যাহার আবির্ভাবে আজ দ্যুলোকে-ভুলোকে এমনই পুলক শিহরণ লাগিল, তিনিই মানবরুপে মহামানব, সৃষ্টি জগতের প্রথম নূর। সকল সৃষ্টির সূচনা এই নূরে মোহাম্মদী (সাঃ) থেকে। তাই তিনি, নিখিল বিশ্বের মূল। মানবজাতির চরমও পরম আদর্শ কুল মাখলুকাতের অনন্ত কল্যাণ, মুর্ত রহমতম মানবজাতির চরম এবং পরম আদর্শ রহমাতুলি­ল আলামীন হযরত আহমদ মুজতবা মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

আমার প্রিয় নবী দুনিয়াতে তশরীফ আনার কয়েকদিন পর, আরব দেশের চিরাচারিত প্রথানুযায়ী বনিসাদ গোত্রের ধাত্রী প্রিয়নবীর দুধ- মা বিবি হালিমা তাঁহাকে লইয়া নিজ গৃহপ্রাণে রওয়ানা করিলেন। দয়াল নবীর মোজেজা প্রকাশ হতে লাগল। হালিমার উটনি ছিল বয়স্ক ও দুর্বল। রহমতে দো-আলম নবীর পরশ পেয়ে উটনি যেন নব যৌবন লাভ করিল। হালিমার সঙ্গী অন্য সকল ধাত্রীগণকে পিছনে রেখে আমার দয়াল নবীকে পিঠে নিয়ে উটনি বিবি হালিমার বাড়িতে উপস্থিত। বিবি হালিমা বর্ণনা করেন- আমি শিশু নবীকে আমার ঘরে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে এক আশ্চর্য্য পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। আমার গৃহে পালিত দূর্বল মেষগুলো অস্বাভাবিক ভাবে পরিপুষ্টি হইয়া উঠিতে লাগিল এবং অধিক পরিমানে দুগ্ধ দান করিতে লাগিল। খেজুর বৃক্ষে প্রচুর পরিমানে খেজুর ফলিতে লাগল। আমার কোন অভাব রহিল না। আমি আরো একটি আশ্চর্য্য ব্যাপার লক্ষ করিলাম, শিশু নবী যখন আমার হতে স্তন পান করিতেন তখন মাত্র একটি স্তনই পান করিতেন। আমার মনে হইতো তিনি যেন জানিয়া শুনিয়া অপর স্তনটি তাহার দুধভাই এর জন্য রাখিয়া দিতেন। (ছোবহান আল্লাহ)।

প্রিয় নবীজির ৬৩ বৎসর হায়াতে জিন্দেগানিতে অসংখ্য মোজেজা সংঘঠিত হইয়াছে। পবিত্র হাদিস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত মোজেজা সমূহ থেকে একটি মোজেজা পাঠক সম্মুখে তুলে ধরলাম- আবু নাঈম হযরত আবু সাইদ খুদরী (রঃ) থেকে বর্ণনা করেন তিনি বলেন- হযরত রাসূলে পাক (সাঃ) এশার নামাজ আদায় করার জন্য বের হলেন। তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। আকাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন ছিল। বাইরে হযরত কাতাদাহ্ ইবনে নোমান (রঃ) কে দেখে রাসূলে পাক (সঃ) বললেন- হে কাতাদাহ্ (রাঃ) যদি নামাজ পড়তে চাও পড়ে নাও। তারপর নামাজ শেষ হবার পর রাসূলে খোদা (সাঃ) হযরত কাতাদার হাতে একটা লাকড়ি দিয়ে বললেন, এটা নিয়ে যাও” এ লাকড়ি তোমার দশ কদম আগে ও দশ কদম পেছনে আলোকিত করবে। (সুবহান আল্লাহ)।

আমার পেয়ারা নবীজির নুরানী স্পর্শে বাক্কা নগরী পবিত্র মক্কা নগরীতে রূপান্তরিত হয়েছে। ইয়াসরীব নগরী হয়েছে মদিনাতুল মনোয়ারা। মহান আল্লাহ হচ্ছেন আমার নবীর আশেক নবীজি (সঃ) হচ্ছেন মাসুক। সৃষ্টি জগতের কোন বস্তুর জন্য নবীজি লালায়িত নয় বরং আরশ-কুরছি লৈাহ্-কলম, জান্নাত-জাহান্নাম, হুর-পরী সকলই নবীজির দীদারের আশায় ব্যাকুল, তাই আমার নবীজি মাতলুব, কোরান, কিতাব, কাবা, জান্নাত, লা-মকাম, আরশ-কুরছি নবীজির তালেব। কেননা আমার পেয়ারা নবীর ছদকায় এই সকল আল­াহ পাক সৃষ্টি করেছেন। বান্দার পক্ষে যত প্রকার ইবাদত বন্দেগী রয়েছে সকল ইবাদাত বন্দেগীর ভিতরে নবী করিম (সঃ) এর স্মরণ থাকতে হবে। অন্যথায় যাবতীয় বন্দেগী বান্দার মুখে নিক্ষেপ করা হবে কঠিন হাসরের মাঠে।

রাসূলে খোদা (সঃ) ও আহলে বাইতে রাসূলগণ (সঃ) কে ভালবাসতে হবে। ফরজ কার্য্যাদির সাথে সাথে সুন্নাতে রাসূল (সঃ) পালন করতে হবে। রাসূলে পাকের প্রকৃত উত্তরসূরি মহান আউলিয়ায়ে কেরাম গনের অনুসরণ অনুকরণের মাধ্যমে নিজের চরিত্র গঠন পূর্বক ইলমে শরীয়তের জ্ঞানের সাথে সাথে ইলমে তাছাউফ অর্জনের দৃঢ় প্রত্যয়ে ইনছানে কামেলগণের সান্নিধ্য অর্জন করতে হবে। তবেই ব্যক্তি হবে খাঁটি ঈমানদার, আশেকে রাসূল। আল্লাহপাক আমাদেরসকলকে নবী প্রেমিক হওয়ার তৌফিক দান করুন। জিয়ারাত মোস্তফা দিদারে মোস্তফা নছিব করুন। আমি, ছুম্মা অমিন।

ট্যাগ :